গুনাহ্ – পাঠ : ০২
প্রিয় পাঠক আমাদের এই কোর্সের দ্বিতীয় মডিউলে আপনাকে স্বাগতম!
এখানে তৌরাত শরিফের প্রথম খণ্ড পয়দায়েশ হতে কয়েকটি আয়াত দেয়া হলো। আপনি মনোযোগের সাথে আয়াতগুলো পাঠ করুন। কারণ এই সকল আয়াত আপনাকে এই পাঠ বুঝতে সাহায্য করবে।
এই পুস্তিকার শেষে প্রশ্নপত্র রয়েছে, সঠিক উত্তরের পাশে টিকচিহ্ন দিন এবং পরবর্তী কোর্স করার সুযোগ নিন।
তৌরাত শরিফ
১ মাবুদ আল্লাহ্র তৈরী ভূমির জীবজন্তুদের মধ্যে সাপ ছিল সবচেয়ে চালাক। এই সাপ একদিন সেই স্ত্রীলোকটিকে বলল, “আল্লাহ্ কি সত্যি তোমাদের বলেছেন যে, বাগানের সব গাছের ফল তোমরা খেতে পারবে না?”
২ জবাবে স্ত্রীলোকটি বললেন, “বাগানের গাছের ফল আমরা খেতে পারি। ৩ তবে বাগানের মাঝখানে যে গাছটি রয়েছে তার ফল সম্বন্ধে আল্লাহ্ বলেছেন, ‘তোমরা তার ফল খাবেও না, ছোঁবেও না। তা করলে তোমাদের মৃত্যু হবে।’”
৪ তখন সাপ স্ত্রীলোকটিকে বলল, “কখনও না, কিছুতেই তোমরা মরবে না। ৫ আল্লাহ্ জানেন, যেদিন তোমরা সেই গাছের ফল খাবে সেই দিনই তোমাদের চোখ খুলে যাবে। তাতে নেকী-বদীর জ্ঞান পেয়ে তোমরা আল্লাহ্র মতই হয়ে উঠবে।”
৬ স্ত্রীলোকটি যখন বুঝলেন যে, গাছটার ফলগুলো খেতে ভাল হবে এবং সেগুলো দেখতেও সুন্দর আর তা ছাড়া জ্ঞান লাভের জন্য কামনা করবার মতও বটে, তখন তিনি কয়েকটা ফল পেড়ে নিয়ে খেলেন। সেই ফল তিনি তাঁর স্বামীকেও দিলেন এবং তাঁর স্বামীও তা খেলেন। ৭ এতে তখনই তাঁদের দু’জনের চোখ খুলে গেল। তাঁরা বুঝতে পারলেন যে, তাঁরা উলংগ অবস্থায় আছেন। তখন তাঁরা কতগুলো ডুমুরের পাতা একসংগে জুড়ে নিয়ে নিজেদের জন্য খাটো ঘাগ্রা তৈরী করে নিলেন।
৮ যখন সন্ধ্যার বাতাস বইতে শুরু করল তখন তাঁরা মাবুদ আল্লাহ্র গলার আওয়াজ শুনতে পেলেন। তিনি বাগানের মধ্যে বেড়াচ্ছিলেন। তখন আদম ও তাঁর স্ত্রী বাগানের গাছপালার মধ্যে নিজেদের লুকালেন যাতে মাবুদ আল্লাহ্র সামনে তাঁদের পড়তে না হয়। ৯ মাবুদ আল্লাহ্ আদমকে ডেকে বললেন, “তুমি কোথায়?”
১০ তিনি বললেন, “বাগানের মধ্যে আমি তোমার গলার আওয়াজ শুনেছি। কিন্তু আমি উলংগ, তাই ভয়ে লুকিয়ে আছি।”
১১ তখন মাবুদ আল্লাহ্ বললেন, “তুমি যে উলংগ সেই কথা কে তোমাকে বলল? যে গাছের ফল খেতে আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম তা কি তুমি খেয়েছ?”
১২ আদম বললেন, “যে স্ত্রীলোককে তুমি আমার সংগিনী হিসাবে দিয়েছ সে-ই আমাকে ঐ গাছের ফল দিয়েছে আর আমি তা খেয়েছি।”
১৩ তখন মাবুদ আল্লাহ্ সেই স্ত্রীলোককে বললেন, “তুমি এ কি করেছ?”
স্ত্রীলোকটি বললেন, “ঐ সাপ আমাকে ছলনা করে ভুলিয়েছে আর সেইজন্য আমি তা খেয়েছি।”
১৪ তখন মাবুদ আল্লাহ্ সেই সাপকে বললেন, “তোমার এই কাজের জন্য ভূমির সমস্ত গৃহপালিত আর বন্য প্রাণীদের মধ্যে তোমাকে সবচেয়ে বেশী বদদোয়া দেওয়া হল। তুমি সারা জীবন পেটের উপর ভর করে চলবে এবং ধুলা খাবে। ১৫ আমি তোমার ও স্ত্রীলোকের মধ্যে এবং তোমার বংশ ও স্ত্রীলোকের মধ্য দিয়ে আসা বংশের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করব। সেই বংশের একজন তোমার মাথা পিষে দেবে আর তুমি তার পায়ের গোড়ালীতে ছোবল মারবে।”
১৬ তারপর তিনি সেই স্ত্রীলোকটিকে বললেন, “আমি তোমার গর্ভকালীন অবস্থায় তোমার কষ্ট অনেক বাড়িয়ে দেব। তুমি যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে সন্তান প্রসব করবে। স্বামীর জন্য তোমার খুব কামনা হবে, আর সে তোমার উপর কর্তৃত্ব করবে।”
১৭ তারপর তিনি আদমকে বললেন, “যে গাছের ফল খেতে আমি নিষেধ করেছিলাম তুমি তোমার স্ত্রীর কথা শুনে তা খেয়েছ। তাই তোমার দরুন মাটিকে বদদোয়া দেওয়া হল। সারা জীবন ভীষণ পরিশ্রম করে তবে তুমি মাটির ফসল খাবে। ১৮ তোমার জন্য মাটিতে কাঁটাগাছ ও শিয়ালকাঁটা গজাবে, কিন্তু তোমার খাবার হবে ক্ষেতের ফসল। ১৯ যে মাটি থেকে তোমাকে তৈরী করা হয়েছিল সেই মাটিতে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তোমাকে খেতে হবে। তোমার এই ধুলার শরীর ধুলাতেই ফিরে যাবে।”
২০ আদম তাঁর স্ত্রীর নাম দিলেন হাওয়া (যার মানে “জীবন”), কারণ তিনি সমস্ত জীবিত লোকদের মা হবেন। ২১ আদম ও তাঁর স্ত্রীর জন্য মাবুদ আল্লাহ্ পশুর চামড়ার পোশাক তৈরী করে তাঁদের পরিয়ে দিলেন।
২২ তারপর মাবুদ আল্লাহ্ বললেন, “দেখ, নেকী-বদীর জ্ঞান পেয়ে মানুষ আমাদের একজনের মত হয়ে উঠেছে। এবার তারা যেন জীবন-গাছের ফল পেড়ে খেয়ে চিরকাল বেঁচে না থাকে সেইজন্য আমাদের কিছু করা দরকার।”
২৩ এই বলে মাবুদ আল্লাহ্ মাটির তৈরী মানুষকে মাটি চাষ করবার জন্য আদন বাগান থেকে বের করে দিলেন। ২৪ এইভাবে তিনি তাঁদের তাড়িয়ে দিলেন। তারপর তিনি জীবন-গাছের কাছে যাওয়ার পথ পাহারা দেবার জন্য আদন বাগানের পূর্ব দিকে কারুবীদের রাখলেন, আর সেই সংগে সেখানে একখানা জ্বলন্ত তলোয়ারও রাখলেন যা অনবরত ঘুরতে থাকল।
তৌরাত শরিফ: পয়দায়েশ ৩:১-২৪
এখন এই পাঠটি পাঠ করুন এবং পাঠের শেষে দেয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন। আপনি যে সব আয়াত পাঠ করেছেন তা এই পাঠে আলোচনা করা হয়েছে।
হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করলেন
আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, আল্লাহ্ হজরত আদম ও বিবি হাওয়াকে বেহেস্তের বাগানে থাকতে দিয়েছিলেন। তাঁরা সকল গাছের ফলই খেতে পারতেন। শুধুমাত্র “নেকী-বদী-জ্ঞানদায়ক গাছের” ফল খাওয়া তাঁদের জন্য নিষেধ ছিল (পয়দায়েশ খণ্ড ২:১৫-১৭)।
একদিন শয়তান সাপের বেশে বিবি হাওয়ার কাছে এল। সে তাঁকে বলল যে ঐ গাছটি খুব ভালো গাছ এবং ঐ গাছের ফল খেলে সে (হাওয়া) আল্লাহ্র মতো জ্ঞানী হবে (পয়দায়েশ খণ্ড ৩:৪-৫)।
পয়দায়েশের ৩য় অধ্যায়ের ৬ আয়াতে আছে যে, বিবি হাওয়ার কাছে শয়তানের পরামর্শ খুব লোভনীয় মনে হলো। তিনি আল্লাহ্র মতো জ্ঞানী হতে চাইলেন। একবার তিনি ঐ গাছটির দিকে চেয়েও দেখলেন এবং তাঁর কাছে গাছটিকে অতি উত্তম মনে হলো। তারপর তিনি ঐ গাছ হতে ফল পেড়ে একটি নিয়ে খেলেন আর একটি হজরত আদমকেও খেতে দিলেন।
হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া শয়তানের পরামর্শ মেনে নিলেন। এভাবে মানুষের প্রথম পিতামাতা আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করলেন। আর এভাবেই গুনাহের শুরু হলো।
প্রত্যেকটি মানুষই গুনাহ্গার
গুনাহ্ সম্পর্কে আপনার চিন্তা কি? গুনাহ্ আপনার শরীরে কিভাবে এসেছে?
একটু ভাবুন তো, সব মানুষের জীবনেই গুনাহ্র স্বভাব কেন দেখা যায়! এই পৃথিবীতে কেউ কি বলতে পারবে আমার মধ্যে গুনাহ্র স্বভাব নেই? সত্য হচ্ছে গুনাহ্ সার্বজনীন। কেননা রাগ হিংসা, লোভ, লালসা, কামনা, বাসনা, মন্দ চিন্তা, এই সব মন্দ স্বভাব দ্বারা আমরা প্রতিদিন গুনাহে জীবন–যাপন করছি। কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই গুনাহের স্বভাবগুলো কিভাবে আপনার জীবনে প্রবেশ করেছে এবং কিভাবে এই গুনাহ্ আপনার অজান্তেই আপনার জীবনে কর্তৃত্ব করছে? পৃথিবীতে কোন মানুষই নিষ্পাপ নয়। কারণ, প্রতিটি মানব সন্তান জন্মগতভাবেই গুনাহের স্বভাব নিয়ে জন্মগ্রহন করেছে; এই কারণে সকল মানুষ গুনাহের অধীন জীবন–যাপন করছে! এটি মহাসত্য। মানুষ গুনাহ্র স্বভাব নিয়ে জন্মগ্রহন করে তাই সকল মানুষই গুনাহ্ করে।
সকল মানুষই হজরত আদম ও বিবি হাওয়ার সন্তান। আর আদম ও হাওয়ার মতো আমরা সকলেই আল্লাহ্কে অমান্য করছি। আল্লাহ্র পাককালামে আছে যে,কারণ সবাই গুনাহ্ করেছে এবং আল্লাহ্র প্রশংসা পাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে (ইঞ্জিল শরিফ, রোমীয় ৩:২৩)।
গুনাহ্ করা ভুল করার চেয়েও বেশি কিছু। আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করলে গুনাহ্ হয়। হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া আল্লাহ্র হুকুম অমান্য করে গুনাহ্ করেছিলেন। আমরাও তদ্রূপ প্রায়ই গুনাহ্ করে থাকি। আমরা যে শুধুমাত্র খারাপ কাজ করি তাই নয় আমাদের অন্তর এবং চিন্তাও গুনাহে পূর্ণ। তাই আমরা সকলেই গুনাহ্গার।
গুনাহই আমাদের লজ্জার কারণ
আপনারা জানেন, গুনাহ্ করার পূর্বে হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়ার কোন রকম লজ্জা ছিল না। এমন কি বেহেস্তের বাগানে তাদের পরনে কোন কাপড়চোপড় না থাকা সত্ত্বেও তাঁরা নিজেদেরকে লজ্জিত মনে করতেন না।
কিন্তু গুনাহ্ করার পর তাঁদের মধ্যে প্রথম লজ্জা এল। তখন তাঁরা নিজেদের শরীর ঢাকার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তৌরাতের পয়দায়েশ খণ্ড ৩:৭ আয়াতে দেখতে পাওয়া যায় যে, তাঁরা ঝোপের নিকট দৌড়ে গেলেন এবং নিজেদের শরীরের চারদিকে গাছের পাতা জড়ালেন।
আমরা সহজেই বুঝতে পারি, তখন হজরত আদম ও বিবি হাওয়ার কী রকম অবস্থা হয়েছিল। আমরাও নানাভাবে আমাদের গুনাহ্ লুকাতে চেষ্টা করি। কারণ আমরা লজ্জা পাই। আমরা গুনাহ্গার বলেই আমরা এরকম করে থাকি।
গুনাহের জন্যই আমরা আল্লাহ্কে ভয় করি
গুনাহ্ করার আগে হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়া সহজভাবে আল্লাহ্র সঙ্গে কথা বলতেন। তখন তাঁরা গুনাহ্গার ছিলেন না। তাই তাঁদের কোন ভয় ছিল না। কিন্তু যখন তাঁরা গুনাহ্ করলেন, মনে আল্লাহ্র ভয় সৃষ্টি হলো। পয়দায়েশ খণ্ড ৩:৮ আয়াতে বলা হয়েছে যে, তাঁরা বেহেস্তের বাগানে লুকালেন। আল্লাহ্র হাত হতে বাঁচার জন্য তাঁরা লুকিয়েছিলেন। তাঁরা জানতেন যে, আল্লাহ্ গুনাহ্ পছন্দ করেন না। কিন্তু তাঁরা যেহেতু গুনাহ্ করেছিলেন, তাই তাঁরা ভয় পেয়েছিলেন।
আমরাও অনেক সময় হজরত আদম ও বিবি হাওয়ার মতো আল্লাহ্কে এড়িয়ে চলতে চাই। আমরা আল্লাহ্র হুকুম ভুলে যাই এবং গুনাহ করি। কিন্তু গুনাহ্ আমাদের জন্য অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। আল্লাহ্ গুনাহ্গারকে পছন্দ করেন না। গুনাহ্গার বান্দার সাথে তাঁর কোন সম্পর্ক থাকে না। গুনাহ্ আমাদের জীবন নষ্ট করে দেয় অর্থাৎ গুনাহের জন্য আমাদের মনে আল্লাহ্র ভয় জন্মে এবং আমরা আল্লাহ্র সঙ্গে স্বাভাবিক সম্পর্ক রাখতে পারি না।
আল্লাহ্ মানুষকে গুনাহ্ হতে রক্ষা করতে চান
গুনাহ্ করার অপরাধে আল্লাহ্ হজরত আদম (আ.) ও বিবি হাওয়াকে বেহেস্তের বাগান হতে বের করে দিলেন। তাঁদের গুনাহের জন্য তাঁরা যেমন কষ্টভোগ করলেন সমস্ত দুনিয়ার উপরেও তেমনি কষ্টের বোঝা নেমে এল। কিন্তু আল্লাহ্ দয়াময়। তিনি আদম, হাওয়া এবং দুনিয়ার সকল মানুষ যাতে গুনাহ, খারাপ কাজ ও শয়তানের হাত হতে রক্ষা পায় তার ব্যবস্থা করতে চাইলেন।
এই উদ্দেশ্যে আল্লাহ্ এই ব্যবস্থার কয়েকটি চিহ্ন দেখাতে শুরু করলেন। এ সকল চিহ্নের মধ্যে দুইটি বিষয় ছিল এ রকম, যেমন:
পয়দায়েশ খণ্ডের ৩:১৫ আয়াতে আপনি দেখতে পাবেন, এক স্ত্রীলোকের গর্ভে এমন একটি পুত্র জন্মাবে যে শয়তানের মাথা গুঁড়ো করে দেবে। মসীহ্ সম্পর্কে এটাই আল্লাহ্র প্রথম ওয়াদা।
পয়দায়েশ খণ্ডের ৩:২১ আয়াতে বলা হয়েছে যে, আল্লাহ্ হজরত আদম ও বিবি হাওয়ার লজ্জা ঢাকার ব্যবস্থা করলেন। তিনি তাঁদেরকে পশুর চামড়ার পোশাক পরিয়ে দিলেন।
পরবর্তী সময়ে নবিগণ এ বিষয়ের অর্থ বুঝিয়ে দিয়েছিলেন।
কিন্তু এখন এটা মনে রাখা অত্যন্ত জরুরি যে হজরত আদম ও বিবি হাওয়া গুনাহ্ করা মাত্রই আল্লাহ্ তাঁদের গুনাহ্ হতে রক্ষা করার একটা ব্যবস্থা করলেন।
সেই ব্যবস্থা বা নাজাত/ উদ্ধারের উপায় সম্পর্কে পরের মডিউল থেকে জানবো।
আপনি চিহ্নিত করতে নিচের Complete বাটনটি ক্নিক করুন।
