আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টি – পাঠ : ০১
প্রিয় পাঠক আমাদের এই কোর্সে আপনাকে স্বাগতম!
মানব জাতির শুরু থেকেই মানুষ সৃষ্টির রহস্য অনুসন্ধানে নানা প্রকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আসমান ও মহাবিশ্বের দৃশ্য–অদৃশ্য যা কিছু আছে তার সৃষ্টিকর্তাকে এবং সৃষ্টির নানা রহস্য সম্পর্কে জানার ইচ্ছা মানুষের অনন্তকালীন।
সৃষ্টি সম্পর্কে কি আপনি কখন ভেবেছেন বা আপনাকে কেন সৃষ্টি করা হয়েছে এই সম্পর্কে?
পাক কিতাবের আলোকে সৃষ্টির বিস্ময়কর তথ্য ও তাৎপর্যগুলো আমরা জানতে পারি, আর এজন্য আমাদের জানার আগ্রহও খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
এই বিশ্বজগৎ যেহেতু সৃষ্টি করা হয়েছে, তাই এই দুনিয়ার অবশ্যই একজন সৃষ্টিকর্তা বা নির্মাতা আছেন আর সেই সৃষ্টিকর্তা বা নির্মাতা হচ্ছেন মহান আল্লাহ্।
আসুন, আমরা সেই সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে জানতে থাকি, যিনি নিজ শক্তিতে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এমন কিছু নেই যা তিনি সৃষ্টি করেননি। সৃষ্টির শুরুতে একমাত্র তিনিই ছিলেন এবং তিনিই তার পবিত্র কালামের শক্তিতে, তাঁর অনন্তকালীন পরিকল্পনায় শূন্য থেকে অত্যন্ত চমৎকার ভাবে দৃশ্য ও অদৃশ্য সবকিছু সৃষ্টি করেছেন।
এখানে তৌরাত শরিফের প্রথম খণ্ড পয়দায়েশ হতে কয়েকটি আয়াত দেয়া হলো। আপনি মনোযোগের সাথে আয়াতগুলো পাঠ করুন। কারণ এসব আয়াত আপনাকে পাঠটি বুঝতে সাহায্য করবে।
তৌরাত শরিফ
১ সৃষ্টির শুরুতেই আল্লাহ্ আসমান ও জমীন সৃষ্টি করলেন। ২ দুনিয়ার উপরটা তখনও কোন বিশেষ আকার পায় নি, আর তার মধ্যে জীবন্ত কিছুই ছিল না; তার উপরে ছিল অন্ধকারে ঢাকা গভীর পানি। আল্লাহ্র রূহ্ সেই পানির উপরে চলাফেরা করছিলেন।
৩-৫ আল্লাহ্ বললেন, “আলো হোক।” আর তাতে আলো হল। তিনি দেখলেন তা চমৎকার হয়েছে। তিনি অন্ধকার থেকে আলোকে আলাদা করে আলোর নাম দিলেন দিন আর অন্ধকারের নাম দিলেন রাত। এইভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই ছিল প্রথম দিন।
৬ তারপর আল্লাহ্ বললেন, “পানির মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি হোক, আর তাতে পানি দু’ভাগ হয়ে যাক।” ৭ এইভাবে আল্লাহ্ পানির মধ্যে একটা ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি করলেন এবং নীচের পানি ও উপরের পানি আলাদা করলেন। তাতে উপরের পানি ও নীচের পানি আলাদা হয়ে গেল। ৮ আল্লাহ্ যে ফাঁকা জায়গার সৃষ্টি করেছিলেন তার নাম তিনি দিলেন আসমান। এইভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই ছিল দ্বিতীয় দিন।
৯ এর পর আল্লাহ্ বললেন, “আসমানের নীচের সব পানি এক জায়গায় জমা হোক এবং শুকনা জায়গা দেখা দিক।” আর তা-ই হল। ১০ আল্লাহ্ সেই শুকনা জায়গার নাম দিলেন ভূমি, আর সেই জমা হওয়া পানির নাম দিলেন সমুদ্র। আল্লাহ্ দেখলেন তা চমৎকার হয়েছে।
১১ তারপর আল্লাহ্ বললেন, “ভূমির উপরে ঘাস গজিয়ে উঠুক; আর এমন সব শস্য ও শাক-সবজীর গাছ হোক যাদের নিজের নিজের বীজ থাকবে। ভূমির উপর বিভিন্ন জাতের ফলের গাছও গজিয়ে উঠুক যেগুলোতে তাদের নিজের নিজের ফল ধরবে; আর সেই সব ফলের মধ্যে থাকবে তাদের নিজের নিজের বীজ।” আর তা-ই হল। ১২ ভূমির মধ্যে ঘাস, নিজের বীজ আছে এমন সব বিভিন্ন জাতের শস্য ও শাক-সবজীর গাছ এবং বিভিন্ন জাতের ফলের গাছের জন্ম হল; আর সেই সব ফলের মধ্যে তাদের নিজের নিজের বীজ ছিল। আল্লাহ্ দেখলেন তা চমৎকার হয়েছে। ১৩ এইভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই ছিল তৃতীয় দিন।
১৪ তারপর আল্লাহ্ বললেন, “আসমানের মধ্যে আলো দেয় এমন সব কিছু দেখা দিক, আর তা রাত থেকে দিনকে আলাদা করুক। সেগুলো আলাদা আলাদা দিন, ঋতু আর বছরের জন্য চিহ্ন হয়ে থাকুক। ১৫ আসমান থেকে সেগুলো দুনিয়ার উপর আলো দিক।” আর তা-ই হল। ১৬ আল্লাহ্ দু’টা বড় আলো তৈরী করলেন। তাদের মধ্যে বড়টিকে দিনের উপর রাজত্ব করবার জন্য, আর ছোটটিকে রাতের উপর রাজত্ব করবার জন্য তৈরী করলেন। তা ছাড়া তিনি তারাও তৈরী করলেন। ১৭ তিনি সেগুলোকে আসমানের মধ্যে স্থাপন করলেন যাতে সেগুলো দুনিয়ার উপর আলো দেয়, ১৮ দিন ও রাতের উপর রাজত্ব করে আর অন্ধকার থেকে আলোকে আলাদা করে রাখে। আল্লাহ্ দেখলেন তা চমৎকার হয়েছে। ১৯ এইভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই ছিল চতুর্থ দিন।
২০ তারপর আল্লাহ্ বললেন, “পানি বিভিন্ন প্রাণীর ঝাঁকে ভরে উঠুক, আর দুনিয়ার উপরে আসমানের মধ্যে বিভিন্ন পাখী উড়ে বেড়াক।” ২১ এইভাবে আল্লাহ্ সমুদ্রের বড় বড় প্রাণী এবং পানির মধ্যে ঝাঁক বেঁধে ঘুরে বেড়ানো বিভিন্ন জাতের প্রাণী সৃষ্টি করলেন। এছাড়া তিনি বিভিন্ন জাতের পাখীও সৃষ্টি করলেন। তাদের প্রত্যেকের নিজের নিজের জাতি অনুসারে বংশ বৃদ্ধি করবার ক্ষমতা রইল। আল্লাহ্ দেখলেন তা চমৎকার হয়েছে। ২২ আল্লাহ্ তাদের এই বলে দোয়া করলেন, “বংশবৃদ্ধির ক্ষমতায় পূর্ণ হয়ে তোমরা নিজেদের সংখ্যা বাড়িয়ে তোলো, আর তা দিয়ে সমুদ্রের পানি পূর্ণ কর। দুনিয়ার উপরে পাখীরাও নিজের নিজের সংখ্যা বাড়িয়ে তুলুক।” ২৩ এইভাবে সন্ধ্যাও গেল সকালও গেল, আর সেটাই ছিল পঞ্চম দিন।
২৪ তারপর আল্লাহ্ বললেন, “মাটি থেকে এমন সব প্রাণীর জন্ম হোক যাদের নিজের নিজের জাতকে বাড়িয়ে তুলবার ক্ষমতা থাকবে। তাদের মধ্যে গৃহপালিত, বন্য ও বুকে-হাঁটা প্রাণী থাকুক।” আর তা-ই হল। ২৫ আল্লাহ্ দুনিয়ার সব রকমের বন্য, গৃহপালিত এবং বুকে-হাঁটা প্রাণী সৃষ্টি করলেন। এদের সকলেরই নিজের নিজের জাতকে বাড়িয়ে তুলবার ক্ষমতা রইল। আল্লাহ্ দেখলেন তা চমৎকার হয়েছে।
তৌরাত শরিফ: পয়দায়েশ ১:১-২৫
এখন এই পাঠটি অধ্যায়ন করুন এবং পাঠের শেষে দেয়া প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন। আপনি যে সব আয়াত পাঠ করেছেন তা এই পাঠে আলোচনা করা হয়েছে।
দুনিয়া কেমন ছিল?
দুনিয়ার উপরটা তখনও কোন বিশেষ আকার পায় নি, আর তার মধ্যে জীবন্ত কিছুই ছিল না; তার উপরে ছিল অন্ধকারে ঢাকা গভীর পানি। আল্লাহ্র রূহ্ সেই পানির উপরে চলাফেরা করছিলেন।
আল্লাহ্ কীভাবে দুনিয়া সৃষ্টি করলেন?
পয়দায়েশের প্রথম অধ্যায়ে আমরা জানতে পারি যে,আল্লাহ্ সাতটি ধাপে দুনিয়া সৃষ্টি করেছেন। এই ধাপগুলোকে “দিন” বলা হয়।
প্রথম দিনে – আল্লাহ্ দিন ও রাত সৃষ্টি করলেন (পয়দায়েশ ১:৩-৫)। আমরা জানি যে, দুনিয়া অনবরত ঘুরছে। ফলে দিন ও রাত হচ্ছে। এভাবে দিনে আমরা যাতে কাজ করতে পারি এবং রাতে ঘুমাতে পারি সে জন্য আল্লাহ্ আমাদেরকে উত্তম ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
দ্বিতীয় দিনে– আল্লাহ্ বাতাস ও মেঘ সৃষ্টি করলেন (পয়দায়েশ ১:৬-৮)। দুনিয়া যাতে সূর্যের তাপে বেশি গরম না হয়ে যায় সেজন্য আল্লাহ্ দুনিয়ার উপরে বাতাসের আবরণ দিলেন। বাতাসের ফলে মেঘ ও বৃষ্টির সৃষ্টি হলো।
তৃতীয় দিনে– আল্লাহ্ সাগরের মধ্য হতে স্থলভূমির সৃষ্টি করলেন (পয়দায়েশ ১:৯-১৩)। এমন কি আমরা দুনিয়ায় যে সকল উঁচু উঁচু পর্বত দেখতে পাই তাও সাগরের তলায় ছিল। এতে আমরা প্রমাণ পাই যে এক সময় সমস্ত দুনিয়া পানিতে ঢাকা ছিল। তৌরাত কিতাবে বলা হয়েছে যে, শুরুতে পানি সব কিছুকে ঘিরে রেখেছিল (পয়দায়েশ ১:৬-১০)। কিন্তু পরে আল্লাহ্র হুকুমে পানির মধ্য হতে স্থলভাগ জেগে উঠল এবং গাছপালা জন্মাতে শুরু করল।
চতুর্থ দিনে– আল্লাহ্ সূর্য, চাঁদ এবং তারা সৃষ্টি করলেন (পয়দায়েশ ১:১৪-১৭)। সূর্য, চাঁদ ও তারা আমাদের অনেক সাহায্য করে। তারা আমাদেরকে শুধু আলোই দেয় না, আমাদেরকে রাতে যাতায়াতের সময়ও সাহায্য করে। সূর্য ও চাঁদ আমাদেরকে যথাক্রমে দিনে ও রাতে আলো দেয় এবং দিন, মাস ও বছর হিসাব করতে সাহায্য করে।
পঞ্চম দিনে– আল্লাহ্ মাছ ও পাখি সৃষ্টি করলেন (পয়দায়েশ ১:২০-২৩)। আপনার মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে যে, এরা কী খেত? আল্লাহ্ তাদের খাবার আগেই তৈরি করে রেখেছিলেন। তৃতীয় দিনে আল্লাহ্ তাদের জন্য গাছপালা তৈরি করেছিলেন। জীব-জানোয়ার সৃষ্টি করার আগে আল্লাহ্ তাদের আহার তৈরি করেছিলেন। এভাবে আমরা আল্লাহ্র কুদরত দেখতে পাই। তিনি কত আশ্চর্যভাবে দুনিয়া সৃষ্টি করেছিলেন!
ষষ্ঠ দিনে– আল্লাহ্ মাটির উপরে বসবাসকারী উট ও গরুর মতো বড় বড় প্রাণী সৃষ্টি করলেন (পয়দায়েশ ১:২৪-২৫)। এ সকল প্রাণীদের বেশির ভাগ আমাদের নিকট অতি উপকারী, এরা আমাদের অনেক কাজে লাগে। আল্লাহ্ এ সময় মানুষও সৃষ্টি করলেন।
সপ্তম দিনে– আল্লাহ্ দুনিয়া সৃষ্টির কাজ শেষ করলেন (পয়দায়েশ ২:২)। দুনিয়া সৃষ্টি করে আল্লাহ্ খুব সন্তুষ্ট হলেন। আল্লাহ্ তাঁর সৃষ্ট বস্তু সকল দেখলেন, সত্যই তা অতি উত্তম ছিল। (পয়দায়েশ ১:৩১)।
আল্লাহ্ দুনিয়া কেন সৃষ্টি করলেন?
দুনিয়া সৃষ্টি করে আল্লাহ্ তা মানুষের হেফাজতে দিলেন। তৌরাত শরিফে আছে, আল্লাহ্ সব কিছু আমাদের ভোগের জন্য দান করেছেন (পয়দায়েশ ১:২৮-৩১)। দুনিয়া আমাদের জন্য আল্লাহ্র নেয়ামত।
আপনি চিহ্নিত করতে নিচের Complete বাটনটি ক্নিক করুন।
